গ্রেপ্তার বা মৃত্যুর আশংকাও করছেন তিনি

হাসিনার প্রত্যাবর্তন কেবলই ঘোষণা না বাস্তবতা?

51

নিজস্ব প্রতিবেদক :

ডিসেম্বর যত এগিয়ে আসছে, ততই জোরালো হচ্ছে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আলোচনা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তিনি ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনা করছেন। আগস্টেও তিনি আবারও ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তবে বাস্তবে তিনি শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরবেন কি না, তা নিয়ে এখনো রাজনৈতিক অঙ্গনে রয়েছে ব্যাপক অনিশ্চয়তা।

শেখ হাসিনার এই ঘোষণাকে ঘিরে আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনৈতিক মহলে যেমন সংশয় রয়েছে, তেমনি আওয়ামী লীগের ভেতরেও বিষয়টি নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ চলছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করছেন। কেউ কেউ মনে করছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে না ফিরলে পরবর্তীতে এমন ঘোষণার রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা আরও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। তবে শেখ হাসিনার ঘোষণার প্রতি জনগণের ঠিক কত শতাংশ মানুষ আস্থা রাখছেন না—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য সাম্প্রতিক জরিপের তথ্য পাওয়া যায়নি।

তবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগের কিছু তৎপরতাও নতুন করে দৃশ্যমান হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল এবং সেখানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ওই ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার এবং অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার করা হয়েছে। আওয়ামী লীগও তাদের ঢাকা মহানগর উত্তর ইউনিটের মিছিলের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিশ্চিত করেছে।

শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকাতেও আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ঝটিকা মিছিল, নাশকতার পরিকল্পনা কিংবা সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তারের খবর এসেছে। ১৫ সেপ্টেম্বর যশোর ও মুন্সিগঞ্জে আওয়ামী লীগের ৫৮ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

এসব ঘটনায় একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের এই তৎপরতা কি কেবল বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি, নাকি ডিসেম্বরকে সামনে রেখে কোনো বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ?

এ প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। তবে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা এবং একই সময়ে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্য তৎপরতা—দুটি বিষয়কে ঘিরেই রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে অন্তর্বর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ আমলের কথিত গুম, হত্যা ও নির্যাতনের বিচার নিশ্চিত করার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনার কথাও জানিয়েছেন।

তবে আওয়ামী লীগবিরোধী কিছু রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহলে সালাহউদ্দিন আহমেদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক আলোচনায় তাঁকে নিয়ে নানা ধরনের অভিযোগও ছড়াচ্ছে। এর মধ্যে তাঁকে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বা ভারতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং প্রকাশ্য নথি ও সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী সালাহউদ্দিন আহমেদ ২০১৫ সালে নিখোঁজ হওয়ার পর ভারতে গিয়ে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেছিলেন এবং ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তাঁর ভারতে অবস্থানের বিষয়টি সত্য হলেও সেখান থেকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ব্যাপারে তাঁর কোনো গোপন বা পরোক্ষ সম্মতি রয়েছে—এমন দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।

বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাই বলছেন। সেপ্টেম্বরে তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং আওয়ামী লীগ আমলের গুম-হত্যার ঘটনায় বিচার নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।

ফলে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রশ্নে এখন মূলত তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—প্রথমত, তাঁর নিজের ঘোষণার বাস্তবায়ন; দ্বিতীয়ত, ডিসেম্বরের আগে আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক সক্ষমতা কতটা বাড়ে; এবং তৃতীয়ত, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে বর্তমান সরকার ও আইনগত প্রক্রিয়া কীভাবে তা মোকাবিলা করে।

শেখ হাসিনা নিজেই বলেছেন, দেশে ফিরলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি মৃত্যুর আশঙ্কাও রয়েছে; তারপরও তিনি দেশে ফিরতে চান। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার তাঁর বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে।

সব মিলিয়ে ডিসেম্বর এখন শুধু একটি সময়সীমা নয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষার সময় হয়ে উঠছে। শেখ হাসিনা সত্যিই দেশে ফেরেন, নাকি ঘোষণাটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয় না—তার ওপর আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়েও নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে। আর সেই কারণেই ডিসেম্বর যত ঘনিয়ে আসছে, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংশয়—দুটিই সমানভাবে বাড়ছে।