গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পে বিপর্যয়, উৎপাদন অর্ধেকে; তিন ব্যবসায়ী নেতার চরম উদ্বেগ

277

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশজুড়ে চলমান গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্পিনিং, তাঁত ও অন্যান্য উৎপাদনমুখী শিল্প ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়া, রপ্তানি ব্যাহত হওয়া, ব্যয় বৃদ্ধি, কারখানা বন্ধ, শ্রমিকদের কর্মহীনতা এবং ব্যাংক ঋণ পরিশোধে অক্ষমতাসহ নানা সংকটে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা। তারা দ্রুত জ্বালানি সংকট নিরসন এবং শিল্পবান্ধব নীতিগত সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে দেশের অনেক নিট পোশাক কারখানা বর্তমানে স্বাভাবিক সক্ষমতার মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ উৎপাদন করতে পারছে। বিশেষ করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে অনেক কারখানার উৎপাদন দীর্ঘ সময়ের জন্য কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে কারখানাগুলোকে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় অন্তত ২০ শতাংশ বেড়ে গেছে। অন্যদিকে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের হাজিরা ও মজুরি পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে উদ্যোক্তারা একদিকে উৎপাদন ক্ষতি, অন্যদিকে আর্থিক লোকসানের দ্বিমুখী চাপের মধ্যে পড়েছেন।

মোহাম্মদ হাতেম আরও বলেন, নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি পণ্য প্রস্তুত করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার বাতিলের হুমকি দিচ্ছেন অথবা বিমানযোগে (এয়ার শিপমেন্ট) পণ্য পাঠানোর চাপ সৃষ্টি করছেন। অথচ এয়ার শিপমেন্টে অতিরিক্ত ব্যয় একটি প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য মুনাফা পুরোপুরি শেষ করে দেয়। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হবে এবং ক্রেতারা ভারত, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলোতে অর্ডার স্থানান্তর করতে পারেন।

তিনি সতর্ক করে বলেন, উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় অনেক উদ্যোক্তা সময়মতো ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। দ্রুত সংকটের সমাধান না হলে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান অনিচ্ছাকৃতভাবে ঋণ খেলাপিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

এদিকে বাংলাদেশ ইয়ার্ন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ ক্লাব লিমিটেডের সভাপতি এম সোলায়মান বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের ধারাবাহিক প্রভাবে দেশের প্রায় ১৫০টি স্পিনিং মিল ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে মাধবদী, নরসিংদী, শেখেরচর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও টাঙ্গাইলের অধিকাংশ তাঁত কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লাখ লাখ তাঁতি ও শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

তিনি বলেন, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি আমদানিকৃত সুতার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। একসময় দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রয়োজনীয় সুতার প্রায় ৮০ শতাংশ দেশীয় মিলগুলো সরবরাহ করলেও বর্তমানে সেই সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

টার্নওভার ট্যাক্সের সমালোচনা করে এম সোলায়মান বলেন, উৎপাদন সংকটের মধ্যেই ১ শতাংশ টার্নওভার ট্যাক্স ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। ব্যাংক লেনদেনের ওপর এ ধরনের কর আরোপ ব্যবসার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। যেখানে কোটি টাকার ব্যবসায় লাভ করাই কঠিন, সেখানে লেনদেনের ওপর বড় অঙ্কের কর কেটে নেওয়া হলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

তিনি সরকারের প্রতি গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত সমাধান এবং টার্নওভার ট্যাক্স পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, অন্যথায় দেশের টেক্সটাইল, স্পিনিং ও তাঁত শিল্প ভয়াবহ ধসের মুখে পড়তে পারে।

একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ আটা-ময়দা মিল মালিক সমিতির সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক মোহাম্মদ সোহাগ। তিনি বলেন, আধুনিক অর্থনীতিতে শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পুরোপুরি জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। কোনো দেশে জ্বালানি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু উৎপাদনই ব্যাহত হয় না, বিদেশি বিনিয়োগও নিরুৎসাহিত হয়।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন শিল্পখাতে উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার এখনো দায়িত্ব গ্রহণের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং সরকার দেশকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

মোহাম্মদ সোহাগ বলেন, সরকার যদি দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে জ্বালানি সংকট নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারে, তাহলে রাষ্ট্র ও সরকার উভয়কেই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। তাই শিল্প ও বিনিয়োগ টিকিয়ে রাখতে যত দ্রুত সম্ভব ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে ব্যবসায়ীরা সরকারের সঙ্গে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।

ব্যবসায়ী নেতারা মনে করেন, দেশের রপ্তানি আয়, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। একই সঙ্গে শিল্প খাতকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা, কর-সুবিধা এবং আর্থিক প্রণোদনা প্রদানেরও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।