শামীম ওসমানের নানা বক্তব্যে তার রহস্যজনক নিরবতা!...

ওসমানদের সঙ্গে জাকির খানের সমঝোতা নিয়ে নানা প্রশ্ন

958

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে তিনি কোনো পদে নেই, অথচ রাজনৈতিক আলোচনায় তার নাম প্রায় নিয়মিতই সামনে আসে। বিএনপির সাবেক ছাত্রদল নেতা জাকির খানকে ঘিরে তাই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে—তার বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান আসলে কী? তিনি কি এখনও ওসমান পরিবারের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে সক্রিয়, নাকি রাজনীতির মাঠে তার অবস্থান বদলেছে?

এই প্রশ্নের সূত্রপাত হয়েছে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা, বক্তব্য এবং রাজনৈতিক সমীকরণ ঘিরে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু জাকির খান ও তার অনুসারীদের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। টিপুর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে জাকির খানের অনুসারীদের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে ট্রল ও সমালোচনা করছেন। এর বিপরীতে বিএনপির ভেতরেই অনেকে প্রশ্ন তুলছেন—শামীম ওসমানের নানা বকএতব্যর পর জাকির খান কেনো নিরব?

জাকির খানের রাজনৈতিক পরিচয় অবশ্য নারায়ণগঞ্জে দীর্ঘদিনের। তিনি জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি। দীর্ঘ সময় কারাবন্দি ও দেশের বাইরে থাকার কারণে তার রাজনীতির বড় একটি সময় মাঠের বাইরে কেটেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে পাঁচ বছরের সাজা ভোগ শেষে তিনি কারামুক্ত হন। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর তার অনুসারীদের বড় ধরনের শোডাউনও দেখা যায়। জেল সুপারের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালের সন্ত্রাস দমন আইনের একটি মামলায় তার ১৪ বছরের সাজা হয়েছিল; আপিল ও রিভিউয়ের পর সেই সাজা কমে পাঁচ বছর হয়। তার আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে থাকা ৩৩টি মামলার মধ্যে ৩২টিতে তিনি খালাস পেয়েছেন এবং একটি মামলায় তিনি জামিনে রয়েছেন।

জাকির খানের রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত দিক তার সঙ্গে ওসমান পরিবারের দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরোধ। নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই তাকে ওসমান পরিবারের শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে তার কারাবন্দিত্বের ইতিহাসের সঙ্গে এই রাজনৈতিক বিরোধের সম্পর্ক নিয়ে নানা সময়ে নানা রাজনৈতিক বক্তব্য ও অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের সবকটির স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এক জায়গায় পাওয়া যায় না। ফলে কোন ঘটনা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল এবং কোনটি আইনি প্রক্রিয়ার অংশ—এটি আলাদা করে দেখা জরুরি।

তবে একটি বিষয় নিয়ে বিতর্ক নেই যে, জাকির খান দীর্ঘ সময় রাজনীতির কারণে কারাগারে ছিলেন এবং ২০২৫ সালে মুক্তির পর তার অনুসারীদের মধ্যে তাকে ঘিরে ব্যাপক রাজনৈতিক আবেগ দেখা যায়।

এ কারণেই নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশের প্রশ্ন—যে জাকির খানকে একসময় ওসমান পরিবারের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, সেই জাকির খান এখন কোথায়?

এই প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়েছে শামীম ওসমানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক তৎপরতার কারণে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থান করে গত কয়েক দিনে শামীম ওসমান আবারও প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন। ১৪ আগস্ট তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের এক অনুষ্ঠানে বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে লক্ষ্য করে কঠোর বক্তব্য দেন এবং ‘খেলা নয়, এবার যুদ্ধ হবে’—এমন মন্তব্য করেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

এরপর ১৬ আগস্ট নিউইয়র্কে শামীম ওসমানকে ঘিরে বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীদের বিক্ষোভের ঘটনাও সংবাদমাধ্যমে আসে। বিক্ষোভের পর তিনি স্থান ত্যাগ করেন বলে একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

অর্থাৎ, ওসমান পরিবারের সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক সংঘাতের পুরোনো অধ্যায়টি যেন আবারও প্রকাশ্য আলোচনায় ফিরছে। কিন্তু এই সময়েই নারায়ণগঞ্জের সেই রাজনৈতিক নেতা জাকির খানকে তুলনামূলকভাবে নীরব দেখা যাওয়ায় প্রশ্ন উঠছে আরও বেশি।

কারণ, নারায়ণগঞ্জের বিএনপির বহু নেতাকর্মীর অভিযোগ—আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময় তারা মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। দলের বর্তমান নেতাদের অনেকেই অতীতের সেই রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা প্রকাশ্যে তুলে ধরছেন। বিভিন্ন সময় বিএনপির নেতারা দাবি করেছেন, দীর্ঘ সময় তারা রাজপথে আন্দোলন করতে গিয়ে মামলা ও নির্যাতনের মুখে পড়েছেন। শামীম ওসমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যের জবাবেও নারায়ণগঞ্জ বিএনপির নেতারা অতীতের রাজনৈতিক দমন-পীড়নের প্রসঙ্গ তুলেছেন।

কিন্তু জাকির খানকে নিয়ে প্রশ্নটা এখানেই—যদি তিনি সত্যিই ওসমান পরিবারের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হয়ে থাকেন, তাহলে শামীম ওসমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যের জবাবে তার কোনো দৃশ্যমান রাজনৈতিক অবস্থান নেই কেন?

আরও একটি বিষয় আলোচনায় এসেছে। জাকির খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে, আওয়ামী লীগের আমলে ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বা তাদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত কিছু ব্যক্তিকে এখন তার আশপাশে দেখা যাচ্ছে এবং কেউ কেউ তার রাজনৈতিক বলয়ে জায়গা করে নিচ্ছেন। বিশেষ করে আজমেরী ওসমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে জাকির খানের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে।

তবে এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারও সঙ্গে ছবি তোলা, একই গাড়িতে থাকা, কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা বা ব্যক্তিগত যোগাযোগ থাকলেই তার রাজনৈতিক আনুগত্য প্রমাণিত হয় না। আবার কোনো ব্যক্তি অতীতে আওয়ামী লীগ বা ওসমান পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন কি না—সেটিও যাচাইযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

তবে সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে জাকির খানের ছায়ায় ওসমান পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকা কয়েকজন ব্যক্তির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সেখানে সোয়াদ হোসেন বান্টি ও ফারুক আহমেদ রিপনের নাম উল্লেখ করে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য দিয়ে আরও যাচাই করা প্রয়োজন।

এদিকে জাকির খানের রাজনৈতিক প্রভাব যে এখনও রয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাতেও তার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়। জুলাইয়ে দেওভোগ মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনা নিরসনে প্রশাসন, পুলিশ এবং স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনায় জাকির খানকে দেখা যায়। একই আলোচনায় মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপুও উপস্থিত ছিলেন। অর্থাৎ, কোনো সাংগঠনিক পদ না থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে জাকির খানের প্রভাব ও মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা যে একেবারে অস্বীকার করার মতো নয়, সেটিও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে দেখা গেছে।

এখানেই তৈরি হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ। একদিকে সাংগঠনিক পদে থাকা নেতারা দলীয় কাঠামোর মাধ্যমে রাজনীতি করছেন, অন্যদিকে জাকির খান কোনো আনুষ্ঠানিক পদ ছাড়াই একটি নিজস্ব অনুসারী বলয় ধরে রেখেছেন। ফলে তার রাজনৈতিক শক্তি কতটা সাংগঠনিক এবং কতটা ব্যক্তিনির্ভর—সেটিও এখন আলোচনার বিষয়।

টিপুর সঙ্গে জাকির খানপন্থীদের সাম্প্রতিক দ্বন্দ্ব এই প্রশ্নটিকে আরও সামনে এনেছে। এর আগেও টিপু জাকির খানের অনুসারীদের রাজপথে সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, জাকির খানের সমর্থকেরা গত ১৫ বছর কোথায় ছিলেন এবং রাজপথে কী ভূমিকা রেখেছেন।

অন্যদিকে জাকির খানপন্থীদের যুক্তি হতে পারে, দীর্ঘ সময় কারাগার, মামলা ও দেশের বাইরে থাকার কারণে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত ছিল। জাকির খানের মুক্তির পর তার অনুসারীদের ব্যাপক উপস্থিতি সেই রাজনৈতিক যোগাযোগ এখনও সক্রিয় থাকারই প্রমাণ—এমন দাবিও তাদের পক্ষ থেকে করা হয়ে থাকে। ২০২৫ সালে তার মুক্তির সময় বিপুলসংখ্যক অনুসারীর উপস্থিতির খবরও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।

ফলে নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে এখন মূল প্রশ্নটি শুধু জাকির খান বনাম টিপু নয়। বরং প্রশ্নটি আরও বড়—জাকির খানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন পথে?

তিনি কি বিএনপির মূলধারার সাংগঠনিক রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হবেন? নাকি পদ-পদবির বাইরে থেকে নিজের আলাদা রাজনৈতিক বলয় ধরে রাখবেন? তিনি কি আবারও ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থান নেবেন? নাকি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় পুরোনো সংঘাতের বদলে নতুন সমীকরণ তৈরি করবেন?

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যাকে দীর্ঘদিন ওসমান পরিবারের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, সেই জাকির খানের আশপাশে যদি সত্যিই ওসমান পরিবারের সাবেক অনুসারীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে, তাহলে সেটি কি নিছক ব্যক্তিগত সম্পর্ক, নাকি নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন কোনো সমঝোতার ইঙ্গিত?

এই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। জাকির খান নিজে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো বিস্তারিত রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দেননি—অন্তত সাম্প্রতিক সংবাদপ্রতিবেদনগুলোতে এমন কোনো সুস্পষ্ট অবস্থান পাওয়া যায়নি। ফলে তার নীরবতাই এখন নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

একসময় যার রাজনীতির অন্যতম পরিচয় ছিল ওসমানবিরোধিতা, সেই জাকির খান এখন যদি সেই ইস্যুতেই নীরব থাকেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—রাজনীতির পুরোনো হিসাব কি বদলে গেছে?

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির আগামী দিনের ঘটনাপ্রবাহই হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে।