নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন ঘিরে নতুন সমীকরণ, সাখাওয়াত কি আইভীর সমর্থন পাবেন?

224

রফিকুল ইসলাম জীবন :

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের আগামী নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই জমে উঠছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখনো একই জায়গায় রয়ে গেছে—সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী কি আদৌ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন?

এই প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই নির্ভর করছে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। কারণ, আইভীর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিচয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। জুলাই আন্দোলনের পর ক্ষমতার পালাবদলের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে এবং দলটির শীর্ষ নেতা শেখ হাসিনাসহ অনেক নেতাকর্মী দেশ ছেড়ে চলে যান। তবে আইভী দেশত্যাগ করেননি।

২০২৫ সালের ৯ মে ভোরে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগে নিজ বাসভবন থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এক বছরেরও বেশি সময় কারাভোগের পর ২০২৬ সালের ৩ জুন রাত ১০টা ১০ মিনিটে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে তিনি জামিনে মুক্তি পান। এরপর থেকে তিনি রাজনৈতিকভাবে কতটা সক্রিয় হতে পারবেন কিংবা নির্বাচন করার সুযোগ পাবেন কি না—সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নির্বাচনের সময় পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে আইভীর নির্বাচনে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে, ভারতের অবস্থানরত শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও সেই ঘোষণা বাস্তবায়িত হবে কি না এবং হলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে এমন সম্ভাবনাও রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।

এদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন বর্তমান নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। বিএনপি সমর্থিত এই নেতা ইতোমধ্যে প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন এবং সর্বশেষ প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করে নগর উন্নয়নের বড় পরিকল্পনার বার্তা দিয়েছেন।

সাখাওয়াত হোসেন খান এর আগেও ডা. আইভীর বিরুদ্ধে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন এবং প্রায় এক লাখ ভোট পেয়েছিলেন। ফলে প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকার পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবেও তিনি এখন শক্ত অবস্থানে রয়েছেন বলে মনে করছেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা।

তাদের মতে, ডা. আইভী যদি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, তাহলে সাখাওয়াত হোসেন খানের জন্য বিজয়ের পথ অনেকটাই সহজ হয়ে যেতে পারে। কারণ, এবার জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন আগের ১১ দলীয় জোট থাকার সম্ভাবনা নেই। সেক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মহানগর সভাপতি মাওলানা আবদুল জব্বারের নাম আলোচনায় রয়েছে। এছাড়া খেলাফত মজলিসের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন সিরাজুল মামুন, যিনি সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির অ্যাডভোকেট আবুল কালামের কাছে পরাজিত হলেও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছিলেন। পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকেও পৃথক মেয়র প্রার্থী দেওয়ার সম্ভাবনার কথা রাজনৈতিক মহলে শোনা যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী ভোট যদি একাধিক প্রার্থীর মধ্যে বিভক্ত হয়, তাহলে তার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হতে পারেন বিএনপির প্রার্থী।

তবে নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে উঠতে পারে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর রাজনৈতিক অবস্থান। তিনি যদি নিজে নির্বাচন করতে না পারেন, তাহলে কাকে সমর্থন করবেন কিংবা আদৌ কোনো অবস্থান নেবেন কি না—সেটি ভোটের ফলাফলে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।

নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ইতিহাসেও এমন নজির রয়েছে। অতীতে ডা. আইভী যখন শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে মেয়র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তখন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্তে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। সেই নির্বাচনে আইভীর বিজয়ের পথ আরও সুগম হয়েছিল। ফলে এবারও নির্বাচনের আগে শেষ মুহূর্তে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা বা নতুন সমীকরণ তৈরি হবে কি না, সেটিও আলোচনায় রয়েছে।

অন্যদিকে, প্রশাসক হিসেবে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান ঘোষিত এক হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে কতটা সফল হন, সেটিও আগামী নির্বাচনের আগে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উন্নয়ন, সেবার মান এবং প্রশাসনিক দক্ষতার মূল্যায়নই শেষ পর্যন্ত ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব মিলিয়ে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন এখনো অনেকটাই সম্ভাবনা, অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর নির্ভরশীল। ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, বিএনপির সাংগঠনিক প্রস্তুতি, বিরোধী শিবিরের ভোটের বিভাজন এবং জাতীয় রাজনীতির গতিপ্রকৃতি—সবকিছু মিলিয়েই নির্ধারিত হবে নগরবাসীর পরবর্তী মেয়র কে হবেন। নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসবে, ততই স্পষ্ট হবে এই বহুল আলোচিত রাজনৈতিক সমীকরণের বাস্তব রূপ।